সর্বশেষ

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ- ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ- ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম না হলে বাংলাদেশর জন্ম হত না
বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ- এ যেন একই মূদ্রার এপিঠ-ওপিঠ দুটি নাম,দুটি শব্দ যেন একে অপরের পরিপূরক যা আজ ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত,একটি ছাড়া অন্যটি যেন মূল্যহীন।বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠায় ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সকল সংগ্রাম ও আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী মহানায়ক বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্রষ্টা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।তার দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগের পথ ধরেই বাঙালি তাদের নিজ আবাসভূমি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।তার নেতৃত্বেই বাঙালি জাতি অনুপ্রাণিত ও ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণ তথা পাকিস্তানি আধিপত্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার নাগপাশ থেকে মুক্ত করেছে আমাদের স্বদেশভূমিকে।বাঙালি জাতির এই প্রাণপুরুষ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় শেখ লুৎফুর রহমান এবং সায়রা বেগমের ঘরে জন্ম নেন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুল ও কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে পড়াশনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাশ করেন। ১৮ বছর বয়সে বেগম ফজিলাতুন্নেসার সাথে তাঁর বিয়ে হয় তাদের ২ মেয়ে-শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা এবং তিন ছেলে- শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেল।
১৯৩৮ সালে গোপালগঞ্জ মহকুমা পরিদর্শনে আসা বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা একে ফজলুল হক ও খাদ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর উপস্থিতিতে কিশোর মুজিব স্কুলের ভাঙা ছাদ দিয়ে পানি পড়া বন্ধে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিজ নেতৃত্বকে সংগঠিত করতে সাংগঠনিক দক্ষতার প্রমাণ রাখেন।
১৯৪০ সালে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠন নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন। কট্টরপন্থী এই সংগঠন ছেড়ে ১৯৪৩ সালে যোগ দেন উদারপন্থী ও প্রগতিশীল সংগঠন বেঙ্গল মুসলিম লীগে পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সংগ্রামের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে নেতৃত্বে আসেন আমাদের স্বাধিকার আন্দোলনের।
১৯৪৭ সালে আগষ্টে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ব্রিটিশ ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তানের উদ্ভব হয়। কিন্তু পাকিস্তানের দু’টি অংশ – পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক ও ভাষাগত দিক থেকে অনেক মৌলিক পার্থক্য বিরাজ করছিল। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করে যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এ ঘোষণার প্রেক্ষাপটে পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানকারী বাংলাভাষী সাধারণ জনগণের মধ্যে গভীর ক্ষোভের জন্ম হয় ও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। কার্যতঃ পূর্ব পাকিস্তান অংশের বাংলাভাষী মানুষ আকস্মিক ও অন্যায্য এ সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারেনি এবং মানসিকভাবে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। ফলস্বরূপ বাংলাভাষার সম-মর্যাদার দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন দ্রুত দানা বেঁধে ওঠে।
১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার ১৫০, মোগলটুলিতে এক যুব সম্মেলনের আয়োজন করে এবং পূর্ব পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুবলীগ নামে নতুন সংগঠন গড়ে যুবনেতা শেখ মুজিব সম্মেলনে প্রস্তাব করেন যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা অধিকাংশ জনগণের মতামতের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।

এদিকে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের সভাকক্ষে এক সাধারণ আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠিত হয় যা পরবর্তিতে সকল সংগ্রাম ও আন্দোলনে অগ্রনী ভূমিকা রাখে, প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে এর নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ।ছাত্রলীগের প্রথম আহবায়ক ছিলেন নাঈমউদ্দিন আহমেদ এবং বর্তমান সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ।
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য অবিস্মরণীয় দিন। এই দিনে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সর্বাত্মক সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। এটাই ছিল ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তথা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এ দেশে প্রথম সফল হরতাল, আব্দুল গণি রোডস্থ সেক্রেটারিয়েট (তৎকালীন ইডেন বিল্ডিং) গেটে পিকেটিং-এ নেতৃত্ব দেবার সময় গ্রেফতার হন যুবনেতা শেখ মুজিবসহ আরও অনেকে। প্রবল ছাত্র আন্দোলনের মুখে মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সাথে ৮ দফা চুক্তিনামা স্বাক্ষর করেন। শর্তানুযায়ী ১৫ মার্চ কারাগার থেকে শেখ মুজিবসহ অন্যান্য বন্দীদের ছেড়ে দেয়া হয়।
জেলে অন্তরীণ থাকা অবস্থায় ১৯৪৯ সালের ২৩ শে জুন নবগঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের যুগ্ম সম্পাদকের তিনটি পদের মধ্যে একটিতে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবের সক্রিয় রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়।১৯৫৩ সালে শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত এ পদে বহাল ছিলেন। ১৯৬৬ সালেই তিনি দলের সভাপতি হন এবং দলকে ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র দেওয়ার জন্য ১৯৫৫ সালে মুজিবের উদ্যোগে দলের নাম হতে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়।১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু সংখ্যক ছাত্র ও প্রগতিশীল কিছু রাজনৈতিক কর্মী মিলে মিছিল শুরু করেন। মিছিলটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের কাছাকাছি এলে পুলিশ ১৪৪ ধারা অবমাননার অজুহাতে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। গুলিতে নিহত হন রফিক, সালাম, বরকত-সহ আরও অনেকে।
১৯৫৩ সালে একুশের প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষে আরমানিটোলা ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেদিন একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস হিসেবে ঘোষনা দেন।
১৯৫৪ সালের মার্চের ৮ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান পরিষদের নির্বাচনে ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসন অর্জ্জন করে সরকার গঠন করে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মন্ত্রী পরিষদে যায়গা করে নেন।
১৯৬৬ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোর জাতীয় সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন ‘আমাদের (বাঙালিদের) মুক্তি সনদ’। শেখ মুজিবুর রহমান মুজিব কর্তৃক ছয়দফা কর্মসূচীর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার পর আইয়ুব সরকার তাঁকে কারারুদ্ধ করে। শেখ মুজিব এবং আরও চৌত্রিশ জনের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে একটি রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দায়ের করা হয় মামলায় অভিযুক্তদের অধিকাংশই ছিলেন পাকিস্তান বিমান এবং নৌবাহিনীর বাঙালি অফিসার এবং কর্মচারী। শেখ মুজিব ইতোমধ্যে কারারুদ্ধ থাকায় তাঁকে এক নম্বর আসামী হিসেবে গ্রেফতার দেখানো হয়।
অবশেষে ১৯৬৯ ২২শে ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শেখ মুজিবকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয় এবং ১৯৬৯ ২৩শে ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে এক আড়ম্বরপূর্ণ সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে পরিষদের সভাপতি তোফায়েল আহমদ শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। মুজিবের মধ্যে তারা এমন একজন ত্যাগী নেতার প্রতিফলন দেখতে পান যিনি ২৩ বছরের পাকিস্তানি শাসনামলের প্রায় ১২ বছর জেলে কাটিয়েছেন।
১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের একমাত্র মুখপাত্র হিসেবে আবির্ভূত হন। তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ ১৬৯ টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে (মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত সাতটি আসন সহ) জয়লাভ করে।
১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের সব প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে রমনা রেসকোর্সে একটি ভাবগম্ভীর অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন এবং শপথ নেন যে, পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের সময় তারা কখনও ছয়দফা থেকে বিচ্যুত হবেন না।
এ পরিস্থিতিতে জেনারেল ইয়াহিয়ার সামরিক জান্তা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের নির্বাচিত নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কেন্দ্রে সরকার গঠন করতে না দেওয়ার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ১ মার্চ এক ঘোষণায় ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন একতরফাভাবে স্থগিত করেন। এ ঘোষণার ফলে পূর্ব পাকিস্তানে সর্বাত্মক বিক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। সমগ্র প্রদেশ তাঁকে সমর্থন জানায়। অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে (২-২৫ মার্চ ১৯৭১) পূর্ব পাকিস্তানের গোটা বেসামরিক প্রশাসন তাঁর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এবং তাঁর নির্দেশমত চলে। তিনি কার্যত অর্থে প্রাদেশের সরকার প্রধান হয়ে যান। লন্ডনের দৈনিক Evening Standard পত্রিকার ভাষায়: ‘জনতার পুরোপুরি সমর্থন পেয়ে শেখ মুজিব যেন পূর্ব পাকিস্তানের কর্তৃত্বে সমাসীন ।
%e0%a6%ac%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a7%e0%a7%81-%e0%a6%93-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6-%e0%a7%a7%e0%a7%af%e0%a7%aa
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ মুজিব রেসকোর্স ময়দানে দশ লক্ষ লোকের বিশাল জমায়েতে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ দেন যা বাঙালি জাতির ইতিহাসে যুগ সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত থাকবে। মুজিব তাঁর ভাষণে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে ব্যর্থ সামরিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগ আনেন। বক্তৃতার শেষে মুজিব ঘোষণা করেন: ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে… মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ… এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য নেতা বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর দলের সাথে আলোচনা শুরু করতে ১৫ মার্চ ঢাকায় আসেন। পরদিন থেকে আলোচনা শুরু হয়, যা মাঝেমধ্যে বিরতিসহ ২৫ মার্চ সকাল পর্যন্ত চলে। এ সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলন এবং লাগাতার হরতাল চলছিল। মার্চের ২ তারিখ থেকে ছাত্র এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা স্বাধীনতা ঘোষণা করতে থাকেন এবং এ ধারা অব্যাহতভাবে চলে। এ পটভূমিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের নামে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিভিন্ন স্থানে পৈশাচিক তান্ডব চালিয়ে ছাত্র-শিক্ষক এবং নিরীহ লোকদের গণহারে হত্যা করে। এভাবে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী দীর্ঘ নয় মাস ধরে গণহত্যা চালিয়ে যায়। শেখ মুজিবকে ২৫ মার্চ রাতে গ্রেফতার করে ঢাকা সেনানিবাসে আটক রাখা হয় এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও বিদ্রোহে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে বিচারের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে তা সম্প্রচারের জন্য ইপিআর ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে চট্টগ্রামে এক ওয়্যারলেস বার্তা পাঠান। তাঁর ঘোষণাটি নিম্নরূপ:
‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা- আজ হতে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের জনগণের প্রতি আমার আহবান, আপনারা যে যেখানেই থাকুন এবং যার যা কিছু আছে তা দিয়ে শেষ পর্যন্ত দখলদার সেনাবাহিনীকে প্রতিহত করুন। বাংলাদেশের মাটি থেকে পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর শেষ সৈনিকটি বিতাড়িত এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আপনাদের এ লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।’
২৫ মার্চ পাকবাহিনীর হামলার পর থেকে যে স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু হয় সে সময় বঙ্গবন্ধু যদিও পাকিস্তানিদের হাতে বন্দী ছিলেন তথাপি ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল তাঁকে তাঁর অনুপস্থিতিতে মুজিবনগর সরকার নামে অভিহিত অস্থায়ী সরকারের রাষ্ট্রপতি করা হয়।জীবন বাঁচাতে প্রায় ১ কোটি মানুষ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর), ইস্ট পাকিস্তান পুলিশ, সামরিক বাহিনীর বাঙ্গালী সদস্য এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী সাধারণ মানুষ দেশকে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর কব্জা থেকে মুক্ত করতে কয়েক মাসের মধ্যে গড়ে তোলে মুক্তিবাহিনী। গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ চালিয়ে মুক্তিবাহিনী সারাদেশে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে অর্থনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক সাহায্য লাভ করে। ডিসেম্বরের শুরুর দিকে যখন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর পতন আনিবার্য হয়ে ওঠে, তখন পরিস্থিতিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।অত:পর ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সরাসরিভাবে জড়িয়ে পড়ে। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণের মুখে ৯মাস যুদ্ধের পর পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান ৯৩,০০০ হাজার সৈন্যসহ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। এরই মাধ্যমে নয় মাস ব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের অবসান হয়; প্রতিষ্ঠিত হয় বাঙ্গালী জাতির প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্রবাংলাদেশ।
শেখ মুজিবকে পাকিস্তানি কারাগার হতে মুক্তি পেয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি লন্ডন ও ভারত হয়ে বিজয়ীর বেশে স্বদেশ প্রর্ত্যাবর্তন করেন।

স্বাধীনতার তিন মাসের মধ্যে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা হয়। ১৫ মাসের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় (৭ মার্চ ১৯৭৩)। একশত চল্লিশটি দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির পথনির্দেশনা নির্ধারণ করেন : ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং কারো প্রতি বিদ্বেষ নয়।’
সর্বোপরি দেশে এরকম একটা অস্থিতিশীল অবস্থার সুযোগ নিয়ে একদল সংক্ষুব্ধ সেনাসদস্য ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাঁকে এবং পরিবারের অন্য যেসব সদস্য তাঁর বাড়িতে অবস্থান করছিলেন তাদের সবাইকে হত্যা করে।
“সাত কোটি বাঙ্গালির ভালোবাসার কাঙ্গাল আমি, আমি সব হারাতে পারি, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা হারাতে পারব না”
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*