সর্বশেষ

ভাসানচর;রোহিংগাদের জন্য নিরাপদ আবাসস্থল

ভাসানচর;রোহিংগাদের জন্য নিরাপদ আবাসস্থল

গতবছর থেকে বাংলাদেশে রোহিংগা সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। মায়ানমারে সরকার ও সামরিক ছত্রছায়ায় রোহিংগা নিধন, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে নৃশংস ভাবে। জোর করে বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে তাদের, যেতে না চাইলে চোখের সামনে হত্যা করা হয়েছে আপনজনদের। লাখে লাখে রোহিংগা তখন নাফ নদী পার হয়ে বাংলাদেশ আর ভারতে প্রবেশ করার সুযোগ চায়। অনেকেই মারা যায় নাফ নদী তে, পাহাড়ে, জংগলে। ভারত একজন রোহিংগা কে ও প্রবেশ করার অনুমতি দেয় নি তাদের সীমান্তে, অথচ রোহিংগাদের এমন অন্যায়, নির্মম করুণ মৃত্যু দেখে চুপ করে থাকতে পারেননি বাংলাদেশ এর মানবতাবাদী প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা। তিনি প্রতিবাদ করলেন রোহিংগাদের উপর এমন অবিচার এর, আশ্রয় দিলেন প্রায় দশ লাখ রোহিংগাদের, আর সারা বিশ্ব কে আহবান করলেন এমন অবিচার এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রোহিংগাদের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করার। বাংলাদেশে আগে ও প্রায় পাচ লাখ রোহিংগা ছিল আর এখন সবমিলিয়ে কমপক্ষে পনের লাখ রোহিংগা এর বসবাস এই বাংলাদেশে। আমাদের ছোট এ দেশের জন্য এত বিশাল পরিমান রোহিংগা এর আবাসস্থল নিশ্চিত করা ও খাবার সহ অন্যান্য মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা সত্যি দুঃসাধ্য ব্যাপার। কক্সবাজার এর বিভিন্ন পাহাড় ও জঙ্গলে ত্রিপল ও বাশের কঞ্চি দিয়ে কোন রকমে মাচা বানিয়ে দিনযাপন করতে হচ্ছিল এই শরণার্থীদের, নেই পর্যাপ্ত অন্ন এর সংস্থান, সু চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সম্মত পরিবেশ। তাই আমাদের মানবিক প্রধানমন্ত্রী এই রোহিংগাদের নিরাপদ ও সুন্দর আবাসন এর কথা চিন্তা করে ১৬০০০ একর সম পরিমাণ এর একটা বড় দ্বীপ তাদের জন্য নির্ধারণ করেন এবং এখানে আধুনিক মানের বাসস্থান, চিকিৎসালয়, মসজিদ, মাদ্রাসা ও স্কুল স্থাপন এর নির্দেশ দেন বাংলাদেশ নৌবাহিনী কে। এই দ্বীপ হবে বাংলাদেশ এর অন্যতম সুন্দর ও সমৃদ্ধ দ্বীপ, যেখানকার উন্নয়ন অত্যন্ত পরিকল্পনা মাফিক। পৃথিবীতে এত সুন্দর নাগরিক সুবিধা সহ সুবিশাল রিফিউজি ক্যাম্প আর দ্বিতীয়টি নেই।

ভাসানচর দ্বীপ এটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এর দেয়া নাম, গুগলে এই দ্বীপ টি খুজে পাবেন Char Piya নামে। এই দ্বীপ টি মূলত মেঘনা নদীর বুকে জাগ্রত ও নোয়াখালী এর হাতিয়া উপজেলার অংশ এবং চট্টগ্রাম জেলার স্বন্দীপ এর পাশে। নোয়াখালী চেয়ারম্যান ঘাট থেকে এই দ্বীপে যেতে সময় লাগে স্পীড বোটে ত্রিশ মিনিট আর ইঞ্জিন বোটে দুই থেকে আড়াই ঘন্টা। চট্টগ্রাম এর সীতাকুন্ড কুমিরা ঘাট থেকে ইঞ্জিন বোটে আড়াই ঘন্টা এবং স্পীড বোটে ত্রিশ মিনিট সময় লাগে আর সন্দীপ থেকে ইঞ্জিন বোটে সময় লাগে মাত্র ত্রিশ মিনিট। আমার প্রাতিষ্ঠানিক কাজে আমি নিজেই চার বার গিয়েছি এই ভাসানচরে, আরো অনেকবার যাব ভবিষ্যতে। আজকে আমি এই লেখাটা লেখার পেছনে অন্যতম বড় কারণ হল একটা গোষ্ঠী রোহিংগাদের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এর এত সুন্দর উপহার (আশ্রয়ণ প্রজেক্ট -৩) নিরাপদ আবাসস্থল কে নস্যাৎ করার জন্য বিভিন্ন প্রপাগান্ডা অত্যন্ত সূক্ষভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছে রোহিংগাদের মাঝে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কে, অথচ তাতে রোহিংগাদের ক্ষতি ছাড়া কোন লাভ নেই। আসলে অনেকেই চায় এই শরণার্থী সমস্যা বছরের পর বছর চলুক। সবচেয়ে অবাক হই কিছু সাংবাদিক ও এই প্রপাগান্ডা তে প্রলুব্ধ। যেহেতু আমি দীর্ঘ প্রায় নয় মাস ধরে ভাসানচর প্রজেক্ট এর সাথে জড়িত তাই বিবেকের তাড়নায় আপনাদের সংশয় মনের অনেক প্রশ্ন সংগ্রহ করেছি এবং তার উত্তর দিচ্ছি।

১) ভাসানচর সাগরের মাঝখানে একটা দ্বীপ, এটা ঘূর্ণিঝড় কিংবা বর্ষাকালে ডুবে যাবে?
উত্তরঃ ভাসানচর এর অবস্থান গুগলে দেখে নিন, এটা মেঘনার বুকে গড়ে উঠা একটা দ্বীপ, যার জন্ম দেড় যুগ এর চেয়ে বেশী। এখানে বন ও গাছপালা রয়েছে এবং দীর্ঘ অনেক বছর ধরে এখানে মহিষ এর খামার করা হয়। এছাড়া জেলেরা অস্থায়ী ভাবে এখানে থাকত মাছ ধরতে আসলে। এই দীর্ঘ দেড় যুগে এই দ্বীপ ডুবে নিশ্চিহ্ন হওয়ার কোন রেকর্ড নেই। তাছাড়া গত নয় মাসে বিশ হাজার শ্রমিক এখানে নিয়মিত কাজ করছে, শীত বর্ষা গ্রীষ্ম সব সিজন ই পার হল কোন অসুবিধা তো হয়নি। এছাড়া বাংলাদেশ নৌবাহিনী এই দ্বীপ এর চার পাশে চৌদ্দ ফুট উঁচু করে ব্লক ও বাধ দিয়েছে যাতে কোন ভাবেই পানি প্রবেশ করতে না পারে ঘূর্ণিঝড় এর সময়।পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ পানি নিষ্কাশন এর জন্য ও আধুনিক প্রযুক্তি এর সমন্বয় ঘটানো হয়েছে।

২) এই দ্বীপে তো আগে কেউ কখনো থাকে নি? মাটি এখনো শক্ত হয় নি, যে কোন সময় ভেংগে যেতে পারে।
উত্তরঃ হাতিয়া ও সন্দীপ এর ঠিক মাঝখানে এই দ্বীপ। বাংলাদেশী মানুষ যদি হাতিয়া সন্দীপে কয়েকশত বছর থাকতে পারে তবে রোহিংগারা ভাসানচর এ কেন থাকতে পারবে না? হাতিয়া সন্দীপ তো কখনো নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় নি, তবে পাশাপাশি এলাকা হয়ে ও কেন ভাসানচর নিয়ে এত সংশয় আপনাদের? ভাসানচর এর কাজ এর কিছু ছবি দিয়েছি ভালভাবে দেখেন তাইলে বুঝতে পারবেন এই মাটি কতটা শক্ত ও নিরাপদ। সরকার এই অঞ্চলে কাজ শুরু করার আগে বেশ কয়েকবার এই দ্বীপে জীবন যাত্রা এর সমীক্ষা চালিয়েছে এবং তারপর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখানে প্রতিটা ডীপ টিউবওয়েল করা হয়েছে এক হাজার ফুট গভীর পর্যন্ত এবং পানি অত্যন্ত সুপেয়। সাইক্লোন সেন্টার গুলোর পাইলিং করা হয়েছে ৭১ ফুট করে। এখানে যে পরিমান ভারী যানবাহন চলে তার ধারণক্ষমতা ও এই মাটির রয়েছে।এরপর ও কি বলবেন এই মাটি বসবাস উপযুক্ত নয়? মাঝে মাঝে আফসোস হয় এই প্রপাগান্ডা কারীদের জন্য।

৩) রোহিংগারা অন্য কোথাও যেতে পারবে না, অনেকটা বন্দীর মত থাকতে হবে?
উত্তরঃ কক্সবাজার এ যে রোহিংগা ক্যাম্প আছে সেখানকার রোহিংগারা কি ইচ্ছেমত ঢাকা চট্টগ্রাম ঘুরে বেড়াতে পারে? কক্সবাজার এর ক্যাম্প এর তুলনায় ভাসানচর আয়তনে অনেক বড় এবং বাসস্থান ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা অত্যন্ত আধুনিক। এখানে তাদের ধর্মীয় শিক্ষা ও বিভিন্ন কর্মমূখি শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে, এবং পাশাপাশি থাকবে কৃষিকাজ ও অন্যান্য অনেক সুযোগ। থাকবে তাদের নির্দিষ্ট আইডি কার্ড যা দেখিয়ে তারা বিভিন্ন ধরণের সুযোগ সুবিধা পাবে এবং অনুমতি সাপেক্ষে বিভিন্ন জায়গায় যেতে পারবে।সেখানে ইতিমধ্যে সব মোবাইল অপারেটর এর নেটওয়ার্ক আছে এবং বিভিন্ন ব্যাকিং সুবিধা বিদ্যমান থাকবে। রোহিংগাদের তাদের নিজ দেশে নিরাপদে প্রত্যাবর্তন না হওয়া পর্যন্ত তারা এখানে নিরাপদে থাকতে পারবে। কক্সবাজার এর চেয়ে অনেক নিরাপদ ও আরামদায়ক বাসস্থান এর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

৪) কোন হিংস্র জীব জন্তু আছে কিনা?
উত্তরঃ কোন হিংস্র জীব জন্তু নেই, আছে শুধু পালিত মহিষ, প্রাকৃতিক কিছু অহিংস্র পশু পাখি।

৫) কতজন রোহিংগা থাকবে সেখানে, বাসস্থান কি রকম?
উত্তরঃ প্রতি এক লক্ষ রোহিংগা এর জন্য ১২০ টা চারতলা বিশিষ্ট শেল্টার স্টেশন এবং ১০৪৪ টি এক তলা বিশিষ্ট ভবন। এভাবে পাচ প্যাকেজে পাচ লক্ষ ভাগ্যবান রোহিংগা এই সুযোগ পাবেন। এখানে সর্বোচ্চ শরণার্থী সুবিধা পাওয়া যাবে।

৬) বিদ্যুৎ ব্যবস্থা থাকবে কিনা?
উত্তরঃ হ্যা, ২৪ ঘন্টা বিদ্যুৎ থাকবে, অলরেডি সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মান করা হচ্ছে যা থেকে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সাপ্লাই হবে।

৭) কোন দেশের ফান্ড এ প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করা হচ্ছে?
উত্তরঃ এই প্রজেক্ট এর ফান্ডিং সম্পূর্ণ বাংলাদেশ সরকার এর। অনেকে মনে করে এটা বিদেশী অনুদান নির্ভর, তবে তা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। এই প্রজেক্ট মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এর চিন্তাপ্রসূত প্রজেক্ট রোহিংগা সমস্যার প্রথম দিক থেকেই। মূলত পর্যটন রাজধানী কক্সবাজার এর প্রাকৃতিক পরিবেশ যেন নষ্ট না হয় এবং রোহিংগারা ও যেন নিরাপদ বাসস্থান পায় সেই উদ্দেশ্যে এই প্রজেক্ট এর চিন্তা ও বাস্তবায়ন। তবে এখানে যারা থাকবে সবাই জাতিসংঘ, আইওএম সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এর নিবন্ধিত থাকবেন এবং সুযোগ সুবিধা ভোগ করবেন।

৮) তবে কি রোহিংগারা চির স্থায়ী হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশে?
উত্তরঃ না, কোন শরণার্থী এখানে স্থায়ী নাগরিক হওয়ার সুযোগ নেই। তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত মানবিক শরণার্থীদের জন্য, উনি বলেছেন প্রয়োজনে নিজের খাবার ভাগ করে খাবেন তবু কোন মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যু এর দিকে ঠেলে দিবেন না। বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক এবং বহু পাক্ষিক ভাবে এই সমস্যা সমাধান এর চেষ্টা করবে এবং সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তারা এই দেশে শরণার্থী সুবিধা নিয়ে থাকবে।

পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর এ শরণার্থী ক্যাম্প বাংলাদেশে বসবাসরত রোহিংগা জনগোষ্ঠীর জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শরণার্থীদের জন্য যে মানবিক পদক্ষেপ গুলো নিয়েছে তা সত্যি অতুলনীয়। তাই তো আজ সারা বিশ্বে দেশরত্ন শেখ হাসিনা পরিচিত মাদার অফ হিউম্যানিটি নামে।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু

লেখকঃ নসরুল কবির কায়েম নাহিদ।

সদস্য, কৃষি ও সমবায় বিষয়ক উপ-কমিটি।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*