সর্বশেষ

ইতিহাসে হারিয়ে যাওয়া এক বিস্মৃত ব্যক্তিত্ব গিরিশচন্দ্র সেন

ইতিহাসে হারিয়ে যাওয়া এক বিস্মৃত ব্যক্তিত্ব গিরিশচন্দ্র সেন

grish c

গিরিশচন্দ্র সেন। আজ ইতিহাসে হারিয়ে যাওয়া এক বিস্মৃত ব্যক্তিত্ব। অথচ জীবিতকাল তিনি যা করেছেন
তা আজো আমাদের হতবুদ্ধি করে দেয়। ভাবতেই অবাক লাগে, তিনিই প্রথম বাঙালী যিনি মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আরবি ভাষার কোরআন শরীফের পূর্ণাঙ্গ বাংলা অনুবাদ করেন এবং এ অনুবাদের মাধ্যমে পরধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা ও সাম্প্রদায়িক মৈত্রীর এক অনন্য সেতু স্থাপন করেন।গিরিশের জন্ম ঢাকা জেলার
নারায়ণগন্জ মহকুমার রূপগন্জ থানার পাঁচদোনা গ্রামের অভিজাত বৈদ্য পরিবারে ১৩১৩ সনের ২২
পৌষ (জানুয়ারী ১৯০৭) । পরিবারের মৌলিক পদবি “সেনগুপ্ত” আর নবাব থেকে প্রাপ্ত পদবি ‘রায়’।
গিরিশচন্দ্র অবশ্য ‘সেন’ ব্যবহার করতেন।গিরিশচন্দ্রের পিতা মাধবরাম রায় এবং পিতৃব্য ফারসি ভাষার পন্ডিত ছিলেন। ফলে গিরিশচন্দ্র এ ভাষার সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী। পাঁচ বছর বয়সে বাংলা হাতে খড়ি হলেও প্রাথমিক শিক্ষারম্ভ হয় ফারসি ভাষা দিয়ে । বাবার নির্দেশে একজন মৌলবি নামাজ
পড়েই ফারসি বর্ণমালা পড়ান।আশ্চর্যের ব্যাপার ছিল গিরিশচন্দ্র সিন্নি দিয়ে মুসলমানি রীতিমাফিক
“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” (পরম করুনাময় ও দয়ালু আল্লাহর নামে আরম্ভ করিতেছি)দোয়া পড়ে ফারসি হরফ পড়া শুরু করেছিলেন । ইংরেজি শিক্ষার প্রসারের সাথে সাথে তাকেঁ ঢাকার পোগোজ স্কুলে ভর্তি করানে হয়।কিন্তু কিন্তু একদিন হেমমাস্টারের বেত্রাঘাতের দৃশ্য দেখে এত ভয় পেয়েছিলেন যে তাকেঁ আর কোনভাবেই ইংরেজি ইস্কুলে যেতে রাজী করানো যায়নি।কৈশোরে ইস্কুল ছাড়ার সম্পর্কে গিরিশচন্দ্র বলেন, “আমার মনে হইতেছে বিধাতার বিধানের চক্রে এই ঘটনা ঘটিয়াছে,আমি ইংরেজি শিক্ষায় নিরন্তর রত থাকিলে এক সময় একটা বড় কেরানী হইয়া বড়লোক হইয়া বসিতাম, আমাকে আর পরিণত বয়সে লখনৌ নগরে যাইয়া কষ্ট করিয়া আরব্য ভাষা চর্চা করিতে হইত না, কোরান ও হাদিস ইত্যাদির অনুবাদ আমার দ্বারা করা হইত না।” ইংরেজি বাদ দিয়ে তিনি মুনশি রুদ্রেশ্বর গুপ্ত,মৌলভী আব্দুল করিম এবং বাঁকা রায়ের কাছে ফারসি শিক্ষালাভ করেন। এর পর তাঁর ছোটদা হরচন্দ্রের (সংস্কৃত ভাষায় পন্ডিত এবং কবি)কাছ থেকে সংস্কৃত শিক্ষা লাভ করেন। পরে নর্মাল ইস্কুলে (হার্ডিং স্কুল)ভর্তি হয়ে পরীক্ষায় প্রথম হয়ে বৃত্তি লাভ করেন। এত টুকু শিক্ষা নিয়ে নিম্নশ্রেণিতে মাস্টারি করেন।এ সময়ে তিনি শেখ সাদীর “গুলিস্তা”এর বঙ্গানুবাদ “হিতোপাখ্যানমালা” রচনা করেন। যা বাংলার অনেকইস্কুলে পাঠ্যপুস্তক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।পরে খ্যাতির কারণে ময়মনসিংহ জেলা ইস্কুলে পন্ডিত পদে নিযুক্ত
হন। কলিকাতা থেকে বাগ্মী পুরুষ কেশবচন্দ্র সেন শহরে আসেন।“কেশবচন্দ্র সেন ছিলেন বিশিষ্ট
ব্রাহ্মনেতা, বক্তা ও বাঙালি হিন্দু সমাজের অন্যতম ধর্মসংস্কারক।ব্রহ্মানন্দ উপাধিতে ভূষিত কেশবচন্দ্র শুধুমাত্র বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্বই ছিলেন না,বরং ভারতের জাতীয় চেতনা ও
ঐক্যের অন্যতম উন্মেষক ও মুখপাত্র হিসাবেও তিনি নন্দিত।ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র হিন্দুসমাজের বর্ণপ্রথা বিলোপ,বিধবা বিবাহের প্রবর্তন ও স্ত্রীশিক্ষার উন্নতিসাধন প্রভৃতি প্রগতিশীল চিন্তাভাবনার সমর্থক ছিলেন। ”গিরিশচন্দ্র তাঁর সংস্পর্শে আসেন একসময় তার ছোটদা হরচন্দ্র এবং পরে তিনি একেশ্বরবাদী ব্রাহ্মধর্মে গ্রহন করেন। । এতে তিনি নিজ গ্রামে সমাজচ্যুত হয়ে অসহায় হয়ে যান। এমতাবস্থায় ব্রাহ্মময়ীকে বিয়ে করেন। তাঁর কন্যা সন্তান মাত্র এক সপ্তাহ বয়সে মারা যায় আর স্ত্রী এক বছর পর বসন্ত রোগে মারা যান। ঐ সময়ে নিজ বাড়ীতে যেমন স্থান হয়নি তেমনি কট্টর হিন্দুদের প্রতিরোধের মুখে শহরেও সমাজ বহির্ভূত হন । এ চরম বিপর্যয়ের মুখে তিনি শিক্ষকতার গুরুভার ছেড়ে দিয়ে কলিকাতা চলে যান।কেশবচন্দ্রের বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করতে থাকেন।পাশাপাশি তিনি “বামবোধিনী”, “পরিচায়কা” এবং ‘মহিলা’ এর মতো মাসিক পত্রিকার সম্পাদনা করেন।আশ্চর্যের ব্যাপার হলো ৪২ বছর
বয়সেই শুরু হয় গিরিশচন্দ্রের জীবনের গৌরবময় এবং সর্বশ্রেষ্ঠ অধ্যায়। উদার কেশবচন্দ্র সেন বিভিন্ন ধর্মকে পরস্পরের নিকটতর করে এক মানব-পরিবার রচনায় উদ্যেগী হন। তাছাড়া তিনি সকল ধর্মের অঙ্গাঙ্গী সম্বন্ধ উপভোগ করে নিজে তৃপ্তি লাভ করতেন এবং এ ব্যাপারে তাঁর সহযোগীদের উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি হিন্দু, বৌদ্ধ,খ্রিস্টান এবং ইসলাম ধর্ম বিষয়ে গবেষনা করার জন্য চারজন সাধককে নিযুক্ত কবেন। ইসলাম অধ্যয়নের দায়িত্ব দেন ভাই গিরিশচন্দ্র সেনকে ।৪২ বছর বয়সে আরবির মতো প্রাচীন ও জঠিল এক দুরহ ও অপরিচিত ভাষা আয়ত্ব করা সত্যিই কি সম্ভব ছিলো? এর চেয়ে বড় ভয়
হিন্দু কর্তৃক পবিত্র কোরআনকে বাংলায় অনুবাদের কাজ তৎকালীন পরিস্থিতে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া করে। কিন্তু অবিশ্বাস্য মানসিক দৃঢ়তা, অবিচল আদর্শ,কর্তব্যনিষ্ঠা, অক্লান্ত পরিশ্রম,বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ, অধ্যবসায়,কেশব চন্দ্রের উৎসাহ এবং কোরআনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজে লেগে গেলেন
। গিরিশ লিখেছিলেন—“ যে ভার বহন যোগ্য অশ্বপৃষ্ঠ, ঈশ্বর সেই ভার দুর্বল গর্দভপৃষ্ঠে স্থাপন করিয়াছেন: এ বিষয়ে তাহার লীলা বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছিনা ।আমি অবিদ্ধান ও নানা প্রকারে অযোগ্য। ” তৎকালীন মোহাম্মদীয় ধর্মশাস্ত্রের অধ্যাপক বিধানাচার্যের প্রবল উৎসাহ নিয়ে গিরিশ লখনৌ গিয়ে আরবি ব্যাকরণ রপ্ত করে কলকাতা আসেন। এর পর ঢাকায় মৌলবি আলিমুদ্দিনের বাড়ী গিয়ে আরবি ইতিহাস ও সাহিত্য বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেন।ফলে তাঁর মধ্যে কোরআন পাঠের ইচ্ছা জাগে। ঐ সময়ে মুসলমান ধর্মপুস্তক বিক্রেতা তাঁর কাছে কোরআন বিক্রি করবেন না মনে করে বন্ধু জালাল উদ্দীনকে দিয়ে কোরআন ক্রয় করেন। তাফসীর(ব্যাখ্যা) সহকোরআন পড়া শুরু করেন। প্রকৃত অর্থ অনুধাবন করার পর সম্পূর্ণ নিমোর্হ দৃষ্ঠিভঙ্গি নিয়ে অনুবাদ শুরু করেন। ১৮৮১ সালে ময়মনসিংহ
শহরে বেনামে প্রথম খন্ড এবং কলকাতায় বাকি খন্ডগুলো প্রকাশিত হয়।(পরে এক খন্ডে বাধাঁ হয়)। ১ম,২য়,তয় এবং ৪র্থ পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ মুদ্রিত হয় যথাক্রমে ১৮৩৬, ১৮৯২,১৯০৮ এবং ১৯৩৬ সালে। প্রথম দিকে গোড়াঁ মুসলমানদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্ঠি হয়েছিলো। কিন্তু প্রকৃত বিদ্বান ব্যক্তিরা (কলিকাতমাদ্রাসার আহমদুল্লাহ, আবদুলআলা এবং আব্দুল আজিজ) ব্যাপক প্রশংসা করে তাঁদের লিখিত
বিবৃতি দেন– -“ আমরা বিশ্বাসে ও জাতিতে মোসলমান।আপনি নি:স্বার্থভাবে জনহিত সাধনের জন্য যে এতাদৃশ চেষ্টা ও কষ্ট সহকারে আমাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরানের গভীর অর্থ প্রচারে সাধারণের উপকার
সাথে নিযুক্ত হইয়াছেন,এজন্য আমাদিগের অত্যুত্তম ও আন্তরিকের বহু কৃতজ্ঞতা আপনার প্রতি দেয়। ” ঢাকার আবুল মজফ্ফর আবদুল্লাগ (১৮৮৮ সাল) লিখেছিলেন “ এই অনুবাদ অতি উত্তম ও শুদ্ধ।. . . এ পর্যন্ত কোরআন শরীফের অবিকল অনুবাদ অন্যকোন ভাষাতে হয় নাই। ” যশোহর থেকে মৌলবি আফতাব উদ্দিন লিখেছেন, “ ১ম ভাগ পাঠ করিয়া পরম পরিতোষ লাভ করিলাম,অনুবাদক যে সকল প্রকার গুরুতর পরিশ্রম, যতœ ও ভূরি অর্থ ব্যয়ভার বহন স্বীকার করিয়া এতাদৃশ্য গ্রন্থ প্রচাররূপ কঠোর ব্রতে দীক্ষিত হইতে প্রয়াসী হইয়াছেন।. . . এ পুস্তকের বাঙ্গলা অনুবাদ অতি উৎকৃষ্ট. .” । অবশেষে ৪র্থ
সংস্করণের (১৯৩৬ সাল) ভূমিকা লিখলেন ভারতবর্ষের প্রথিতযশা ইসলামী চিন্তাবিদ মৌলানা আকরাম খাঁ। তিনি করেন।আরবি, উর্দু,ফারসি এবং ইংরেজি ভাষায় পন্ডিত ছিলেন। “মোহাম্মদী” (১৯১০ সাল)
এর পর “দৈনিক আজাদ” পত্রিকার (১৯৩৬ সাল) পত্রিকা প্রকাশ করেন।আরবি, উর্দু,ফারসি এবংইংরেজি ভাষায় পন্ডিত ছিলেন। তিনি লিখেছেন- “তিন কোটি মোছলমানের মাতৃভাষা যে বাংলা তাহাতেকোরানের
অনুবাদ প্রকাশের কল্পনা ১৮৭৬খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এ দেশের কোন মনিষীর দৃষ্টি আকর্ষন করিতে পারে নাই। তখন আরবি-ফারসি ভাষার সুপন্ডিত মোছলমানের অভাব বাংলাদেশে ছিল না। তাঁহাদের মধ্যকার কাহারও যে বাংলা সাহিত্যের উপরও যে যথেষ্ট অধিকার ছিল তাঁহাদের রচিত বা অনুদিত বিভিন্ন পুস্তক
হইতে তাহার অনেক প্রমান পাওয়া যায়। কিন্তু এই মনোযোগ দেওয়ার মতো সুযোগ তাঁহাদের একজনেরও ঘটিয়া উঠে নাই। এই গুরুদায়িত্ব বহন করিবার জন্য দৃঢ় সংকল্প নিয়া, সর্বপ্রথমে প্রস্তুত
হইলেন বাংলার একজন হিন্দুসন্তান, ভাই গিরিশচন্দ্র সেন-বিধান আচার্য কেশবচন্দ্রের নির্দেশানুসারে।. .. . . .”গিরিশচন্দ্রের এই অসাধারণ সাধনা ও অনুপম সিদ্ধিকে তিনি জগতের বিরল ঘটানা বলে মন্তব্য করেছেন।কোরআনের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ছাড়াও অনেক ধ্রুপদি ইসলামি গ্রন্থ অনুবাদ করেন। গিরিশচন্দ্র সেন-এর অন্যান্য গ্রন্থ দুষ্প্রাপ্য হলেও কোরআনের অনুবাদ এখন সহজলভ্য।গিরিশচন্দ্র প্রায় ৪০টির মতো মৌলিক গ্রন্থ রচনা করেন।অনেকগুলো গ্রন্থের বিক্রয় উল্লেখযোগ্য। তিনি উইল করে গেছেন তাঁর প্রাপ্তটাকার ২৫শতাংশ নববিধান প্রচারের জন্য ব্যয় করা হবে। ৭৫ শতাংশ টাকা ব্যয় হবে তাঁর নিজগ্রাম পাঁচদোনার গরীবদু;খিনী, বিধবা, অসহায় দরিদ্র বৃদ্ধ,রোগী এবং নি:সম্বল শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যায়, জলকষ্ট নিবারণ,গৃহনির্মান এর মতো জনহিতকর কাজের জন্য। শেষ জীবনে গিরিশকে মুসলমানের কেউ “ভাই” কেউ “মৌলবি”ডাকতেন। “মৌলবি” বলে সম্বোধন করা হলে তিনি বলেন, “আমি তাহাতে লজ্জিত ও সংকুচিত হইতেছি। বাস্তবিক আমি এরূপ সম্বোধন ও সম্মান পাইবার সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত। ”এ মহান ব্যক্তির তাঁর অন্তিম ইচ্ছা ছিল জীবনের শেষদিন গুলো ঢাকায় কাটাবেন। এবং ১৯১০ সালে তাঁর প্রিয় ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
-সংগ্রহীত।

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Research Publishing Academy in the UK
Research Publishing Academy in the UK