সর্বশেষ

ঈদের ছুটিতে যেতে পারেন ভুটান

ঈদের ছুটিতে যেতে পারেন ভুটান

টাইগার নেস্টে ওঠার পথে পাহাড়ের ওপর মেঘের খেলা।

ঈদের ছুটিতে হাতে যদি পাঁচ–ছয় দিন সময় থাকে, তাহলে ভুটানে যেতে পারেন। উঁচু উঁচু পাহাড়ে সবুজের হাতছানি আর পাহাড়ি ফুলের দেখা পেতে এই সময়টা হতে পারে দারুণ। আমরা ছয় দিনের ছুটি নিয়ে গিয়েছিলাম ভুটানে। গত ফেব্রুয়ারিতে ঠান্ডাও ছিল বেশ। কিন্তু এখন চমৎকার আবহাওয়া।

আগে যাঁরা গেছেন, সবাই বলেছেন, সড়কপথে ভুটান নাকি অনেক বেশি রোমাঞ্চকর! বুড়িমারী চেংড়াবান্দা হয়ে জয়গাঁও সীমান্ত দিয়ে ভুটান গেটে আসার পর ঠিক করা হলো গাড়ি। পাঁচ দিন আমরা ঘুরব ভুটানের পারো, থিম্পু, পুনাখা আর ফুন্টশোলিং শহর। আমাদের সঙ্গী হলেন চালক সানম। ভুটান গেট থেকে শুরু হলো যাত্রা। শুরুতে মিলল রোমাঞ্চের আভাস। পথের বাঁকে বাঁকে পাহাড়ের চূড়ায় মেঘের আনাগোনা। উঁচু উঁচু পাহাড়ের বাঁক দিয়ে শাঁই শাঁই করে ছুটছে গাড়ি। রাস্তার নিচে তাকালে হঠাৎ যেন শূন্য লাগে। বড় বড় খাদ। গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারালেই অক্কা! সানম এমনভাবে গাড়ি চালাচ্ছেন যেন এটা তাঁর খেলনা!

দুর্গম টাইগার নেস্ট।দুর্গম টাইগার নেস্ট।

পাঁচ ঘণ্টার ভ্রমণ শেষে আমরা সন্ধ্যায় পৌঁছলাম পারো শহরে। হোটেল ঠিক করাই ছিল। সকাল ১০টায় আমরা শুরু করলাম পারো শহরের জাদুঘর আর তার সঙ্গেই থাকা একটি জং (ধর্মীয় প্রার্থনার স্থান) দেখে। জাদুঘরের ভেতর ভুটানের বিখ্যাত সব মুখোশ। একেকটা একেক রকম। কোনোটা রাক্ষসের, কোনোটাবা ভয়ংকর জন্তুর। এখানে চিতাবাঘ, পাখিসহ আরও বেশ কিছু জন্তু আছে বিশেষভাবে সংরক্ষণ করা। দেখে জীবন্তই মনে হয়।

বিশাল জং গড়ে তোলা হয়েছে পাহাড়ের পাদদেশে। ওপর থেকে দেখা মেলে পারো শহরটা। রংবেরঙের বাড়ি। বাড়িগুলোর বিশেষত্ব হলো প্রতিটির গায়ে গায়ে হাতের নকশা করা। এখান থেকে আমরা চলে গেলাম পাশের আরেকটি জং দেখতে। এদের জংগুলো অনেকটা একই রকম। দুপুর হয়ে গেলে আমরা ফিরে এলাম হোটেলে। বিকেলে পারোতে দেখার কী আছে জানতে চাইলে চালক বললেন, একটা বিশেষ মন্দির আর টাইগার নেস্টের জন্য আলাদা একটি দিন লাগবে। শুধু মন্দির দেখার পর তো আর কাজ নেই। কী করা যায়? পারোতে বরফ দেখা যাবে?

পারোর চেলিলা পাসে তুষারপাত ও বরফ।পারোর চেলিলা পাসে তুষারপাত ও বরফ।

চালক বললেন, পাহাড়ের ওপর দিয়ে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলে চেলিলা পাস গেলে বরফের দেখা পাওয়া যেতেও পারে। তবে নিশ্চয়তা নেই। আমরা একটা সুযোগ নিলাম। চেলিলা পাসের পথে শুরু হলো যাত্রা। যতই ওপরে উঠছি, কান ঝিঁ ঝিঁ করছে—বুঝতে পারছি কানে ‘তালা’ লাগছে।

ঝিরঝির করে পড়ছে তুষার।ঝিরঝির করে পড়ছে তুষার।

চালক বললেন, ভয়ের কিছু নেই। ওপরে উঠলে এমন লাগে। দেড় ঘণ্টা পর ২৫ কিলোমিটার পথ শেষ হতেই খুব মিহি তুষারপাতের দেখা মিলল। ছোপ ছোট বরফ লেগে আছে রাস্তায়। আমরা কিছুটা আশা পেলাম। যতই পথ এগোচ্ছে, বরফ বাড়ছে। এভাবে ২৯ কিলোমিটার যাওয়ার পর বেশ ভালো তুষারপাত। দেখি সামনের রাস্তায় প্রচুর বরফ জমে আছে। চালক বললেন, সামনে গেলে ফেরার পথে সমস্যা হতে পারে। আমার গাড়ি থেকে নামলাম। চারদিকে শুধু বরফ। তুষার বাড়তেই থাকল। একটা সময় এমন হলো, ক্যামেরায় ঠিকমতো ছবিই তোলা যাচ্ছিল না। তুষারকণা এসে লেন্সের ওপর পড়ছিল। আমাদের সঙ্গে থাকা দুই শিশু তুষারে ভিজেই বরফ দিয়ে বানিয়ে ফেলেছে স্নোম্যান! একটা সময় তুষার এতই বাড়ল যে আমরা গাড়িতে বসে থেকে সেটি দেখতে থাকলাম। বেশি দেরি হলে ফিরতে সমস্যা হতে পারে ভেবে সেখান থেকে ফিরতে শুরু করলাম। ফিরে এলাম সেই মন্দিরে। কাইছু লাখাং তার নাম। সপ্তম শতকে তৈরি এই মন্দির ভুটানের প্রাচীনতম মন্দিরগুলোর একটি। ভুটানের লোকদের বিশ্বাস, দিনের বেলা এটি মানুষ গড়েছে আর রাতে গড়েছে প্রেত! রাত নেমে এল পারোতে। স্মারক উপহারের দোকানগুলোতে ভুটানের নানা ঐতিহ্যবাহী জিনিসপত্র পাওয়া যায়। দেখতে গেলাম। দাম বেশি হওয়ায় কিনতে পারলাম খুব সামান্য কিছু!

শুভ্র তুষার মন ভালো করে দেয়। শুভ্র তুষার মন ভালো করে দেয়।

ইন্টারনেটে ভুটান সার্চ দিলে সবার আগে আসে এই টাইগার নেস্ট। জানা যায়, অষ্টম শতকে তিন বছর তিন মাস তিন দিন তিন ঘণ্টায় তৈরি হয়েছে এটি। পরদিন গেলাম সেই টাইগার নেস্টে। নাম বাঘের হলেও এখানে বাঘের দেখা মিলবে না! সমতল থেকে পাক্কা পাঁচ কিলোমিটার ওপরে। হেঁটে উঠতে হয় ১০ হাজার ফুটের ওপর! পাহাড়ের ওপর এই বিশেষ স্থাপনা। শক্ত মনোবল আর ধৈর্য থাকতে হবে। উঠতে প্রায় চার ঘণ্টা লেগে যায়। স্থাপনার ভেতরে যে মন্দির আছে, সেটি দেখতেই এত দূরে আসা। নেমে আসতে লাগে দেড় ঘণ্টা। নেমে আসতে আসতে মনে হচ্ছে, কিছু একটা জয় করে ফেলেছি! নামার পথেই দেখা গেল কাছের পাহাড়ের চূড়ায় বরফ রোদের আলোয় চিক চিক করছে। সেখানে খেলা করছে মেঘ!

হোটেলে ফিরেই আমরা চললাম থিম্পুর পথে। সেই একই রকম পথ। উঁচু পাহাড়ে ঘেরা রাস্তা। বিকেলে থিম্পু ঢুকেই দূর থেকে দেখা মিলল গৌতম বুদ্ধের বড় এক মূর্তির। মূর্তিটি ১৬৯ ফুট উঁচু (প্রায় ১৭ তালা ভবনের সমান)। চতুর্থ রাজা জিগমে সিঙ্গে ওয়াংচুকের ৬০তম জন্মবার্ষিকী উদ্‌যাপনে উপলক্ষে ভুটানের রাজধানী থিম্পুর কুয়েসেলফোদরং পাহাড়ে বিশালাকায় এই মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এখানে আরও আছে বেশ কিছু মূর্তি। দেখে অবাক হতে হয়। এখান থেকেই দেখা যায় পুরো থিম্পু শহর। রাতে ক্লক টাওয়ার আর থিম্পুর দোকানগুলো ঘুরে দেখলাম।

পারোর জং গড়ে তোলা হয়েছে পাহাড়ের পাদদেশে।পারোর জং গড়ে তোলা হয়েছে পাহাড়ের পাদদেশে।

থিম্পু শহরে সকাল সকাল উঠে পুনাখা যাওয়ার তোড়জোড়। ওখানে গেলে আলাদা অনুমতি নিতে হয়। টিপটিপ বৃষ্টির মধ্যেই আমরা যেতে থাকলাম পুনাখা। এই পথই দোচলা পাস। ভুটানের রাজধানী থিম্পু থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। উচ্চতা প্রায় সাড়ে ১০ ফুট৷ সেখানে নেমে মন ভরে গেল এর সৌন্দর্য দেখে। এতে আছে সারি সারি ১০৮টি স্তুপা বা স্মৃতিস্তম্ভ। এখানেও বাড়তি হিসেবে মিলল তুষারপাত। এখান থেকে দুই ঘণ্টার পর পৌঁছলাম পুনাখাতে। দুপুরের খাবার খেয়েই বেরিয়ে পড়লাম।

পুনাখা জায়গাটা ভুটানের গ্রাম। এখানে দেখার মতো একটি প্রাচীন জং আছে। পাশে বয়ে গেছে নদী। নদী বয়ে যাওয়ার কল কল শব্দ আর এই জং অপূর্ব এক দৃশ্যই বটে! এটি দুর্গের আদলে তৈরি একধরনের স্থাপত্য, যেখানে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা থাকেন।

দোচলা পাস।দোচলা পাস।

এখান থেকে কিছুদূর যেতেই মিলল পুনাখা সাসপেনশন ব্রিজ বা সেতু। ফো চু নদীর ওপর নির্মিত এই ঝুলন্ত সেতু। ৩৫০ মিটার লম্বা এই সেতুর ওপর দেখা যায় নদী আর পাহাড়ের মনকাড়া দৃশ্য। এখানে নীল হয়ে গেছে নদীর পানি।

আমরা থিম্পুর পথ ধরলাম। সন্ধ্যা নেমে এল পাহাড়ে। দোচুলা পাসের পাশে আসতেই গাড়িতে বসে দেখি আবার তুষার পড়ছে। গাছ, রাস্তা সাদা হয়ে আছে।

থিম্পুতে গৌতম বুদ্ধের বড় মূর্তি।থিম্পুতে গৌতম বুদ্ধের বড় মূর্তি।

ভুটানে এসে রোদ, বৃষ্টি, তুষার সবকিছুর দেখাই পেলাম। ভুটানে কোনো অস্থিরতা নেই। শান্ত এক দেশ। রাস্তায় পরপর গাড়ি, কিন্তু হর্নের শব্দ শোনা যায় না। ফেরার দিন ফুন্টশোলিংয়ে চালক সানম জানালেন, আমাদের মাঠে একটু থামতে হবে। নেমে দেখি তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে আমাদের জন্য মাছ, মাংস আর ভাত রেঁধে এনেছেন। আমরা সত্যিই এমনটা আশা করিনি!

পুনাখা সাসপেনশন ব্রিজ।পুনাখা সাসপেনশন ব্রিজ।

যেভাবে যাবেন ও যা করবেন: সড়কপথে যেতে ভারতের ট্রানজিট ভিসা নিতে হবে। এ জন্য অনলাইনে ভিসার আবেদন ফরম পূরণ করতে হবে। আর সেখানে উল্লেখ থাকতে হবে যে আপনি ট্রানজিট ভিসা চান। ভিসার আবেদনপত্রের সঙ্গে দিতে হবে শিলিগুড়ি যাওয়ার বাসের অগ্রিম টিকিট। যমুনা ফিউচার পার্কের নিচে থাকা ভিসা আবেদন কেন্দ্রে আবেদন জমা দিতে হবে। কোনো ট্রাভেল এজেন্সির সহায়তা নিতে পারেন আপনি। তারাই সব ব্যবস্থা করে দেবে। আপনি শুধু ভিসার আবেদনপত্র জমা দেবেন।

পুনাখার জং গড়ে উঠেছে নদী আর পাহাড়ের পাদদেশে।পুনাখার জং গড়ে উঠেছে নদী আর পাহাড়ের পাদদেশে।

ট্রানজিট ভিসার সুবিধা হলো, আপনি ভারতে ঢোকার পর ৭২ ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করে ভুটানে প্রবেশ করতে পারবেন। আবার ফেরার সময় আরও ৭২ ঘণ্টা থাকতে পারেন। এই সময়ে দার্জিলিং বা সিকিমের অংশ ঘুরতে পারবেন। তবে কোনো অবস্থাতেই ৭২ ঘণ্টার বেশি থাকা যাবে না। তাহলে পরবর্তী সময়ে ভারতের ভিসা পেতে সমস্যা হবে।

ভুটানের শুভেচ্ছা স্মারক।ভুটানের শুভেচ্ছা স্মারক।

বাসে করে গিয়ে বুড়িমারী সীমান্তে নামতে হবে। এরপর চেংড়াবান্ধা দিয়ে জয়গাঁও সীমান্ত। এরপর ভুটানের গেটে প্রবেশ করে আপনাকে ভুটানের ভিসা নিতে হবে। সেটি নিতে ৫ থেকে ১০ মিনিট সময় লাগে। সেখানেই অনেক গাড়ি পাবেন। যত দিন ঘুরতে চান, তত দিনের জন্য একেবারেই গাড়ি ঠিক করে নিলে ভালো হবে। দিনপ্রতি দুই হাজার রুপি খরচ হয়—এমনভাবে গাড়ি ঠিক করে নিন। ভুটানে ঢোকার সময় আপনার ডলার ভুটানের মুদ্রায় পরিবর্তিত করে নিন। সেখান থেকে গাড়ি করে পারো, থিম্পু, পুনাখা শেষ করে ফুন্টশোলিং। পরে আবার একই পথে ফিরে আসা। ঢাকা থেকে দ্রুত বিমানে সরাসরি ভুটানে যাওয়া যাবে। সে ক্ষেত্রে খরচ বেশি হবে।পাহাড়ের ওপর থেকে দেখা থিম্পু শহর।পাহাড়ের ওপর থেকে দেখা থিম্পু শহর।

সুত্রঃ প্রথম আলো

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Research Publishing Academy in the UK
Research Publishing Academy in the UK