সর্বশেষ

শবে বরাত- রাজনৈতিক ও ইসলামিক দৃষ্টিকোণে পবিত্র শবে বরাত

শবে বরাত || রাজনৈতিক ও ইসলামিক দৃষ্টিকোণ আজ পবিত্র শবে বরাত । হাদিস শরিফে যাকে ‘নিসফ শাবান’ বা ‘শাবান মাসের মধ্য দিবসের রজনী’ বলা হয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশ, পারস্যসহ পৃথিবীর অনেক দেশের ফারসি, উর্দু, বাংলা, হিন্দিসহ নানা ভাষায় যা ‘শবে বরাত’ নামেই অধিক পরিচিত।হাদিস শরিফে আছে, ‘হজরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা অর্ধশাবানের রাতে মাখলুকাতের দিকে রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া আর সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (ইবনে হিব্বান: ৫৬৬৫, ইবনে মাজাহ: ১৩৯০, রাজিন: ২০৪৮; ইবনে খুজাইমা, কিতাবুত তাওহিদ, পৃষ্ঠা: ১৩৬, মুসনাদে আহমদ, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৭৬ইতিমধ্যে আমাদের দেশে শবে বরাত সম্পর্কিত আমলে বিভিন্ন ধোঁয়াশা তৈরি করেছেন একদল আলেম। আজ থেকে 10 বছর আগেও শবে বরাত অত্যন্ত ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সাথে পালন করা হতো বাংলাদেশে। বর্তমানে তরুণ প্রজন্ম, আলেম-ওলামাদের এই দ্বন্দ্বের কারণে এই রাতের আমল ও গুরুত্ব প্রায়ই ছেড়ে দিয়েছে। যারা শবে বরাতের বিপক্ষে তাদের বক্তব্য হচ্ছে সৌদি আরব থেকে শুরু করে বেশ কিছু মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রে শবেবরাত পালিত হয় না । অথচ গভীর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় শবে বরাত সম্পর্কিত সহীহ হাদিসের সংখ্যা প্রায় 7 এর অধিক এবং 35 টি তাফসির কিতাবে এর গুরুত্ব উল্লেখ রয়েছে। শুধু শবেবরাত নয় ইসলামী আহকাম নিয়ে বর্তমানে যে দ্বন্দ্ব সেগুলো আলোচনা করতে গেলে বিষয়গুলো ধর্মীয়ভাবে যেমন ব্যাখ্যার দাবি রাখে পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবেও ব্যাখ্যা দাবি রাখে।

১. ইসলামের সূচনা মক্কা-মদিনা থেকে হলেও পরবর্তীতে ইসলামের খাঁটি আলেম,স্কলার, আমলদার ব্যক্তি, বুজুর্গ, গাউস, কুতুব মক্কা-মদিনায় স্থায়ীভাবে থাকতে পারেননি। খোলাফায়ে রাশেদীনের পরে যখন মুয়াবিয়া ( রাঃ) খিলাফতের দায়িত্ব নেন এবং তার শেষ সময়ে তারই অযোগ্য পুত্র ইয়াজিদকে খলিফা হিসাবে নিযুক্ত করে ইসলামে রাজতন্ত্র কায়েম করেন তখন সাহাবী থেকে শুরু করে প্রকৃত ইসলামিক স্কলার, আলেমেদ্বীন তারা ইয়াজিদ এর মত অযোগ্য, মদ্যপ, ব্যভিচারী এমনকি ইমাম হোসেন রাঃ এর হত্যার নির্দেশদাতা এই ইয়াজিদকে খলিফা হিসাবে কিছুতেই ‌মেনে নিতে পারেননি। ফলশ্রুতিতে শুরু হয় রাজনৈতিক ইসলামের বিকাশ। ইয়াজিদের অনুসারীরা তখন ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে গিয়ে হাক্কানী আলেমদের উপর অত্যাচার শুরু করেন। মূলত এই হাক্কানি আলেমরা ছিলেন ইমাম হোসেন (রাঃ) পক্ষে তথা আহলে বাইত কিংবা নবীর আদর্শ ও কোরান হাদিসের অনুসারী। পাশাপাশি ইয়াজিদ এবং তার পক্ষের লোকজন একদল অনুগত দরবারী আলেম সৃষ্টি করেন যারা বিভিন্ন কিতাবের মাধ্যমে ইয়াজিদের আনুগত্য, বৈধতা ইত্যাদি বিষয়গুলো কোরআন হাদিসের আলোকে ইয়াজিদের পক্ষে প্রচার করতে থাকেন। [ইয়াজিদের দরবারে দরবারী আলেমের মত আমাদের মোগল সাম্রাজ্যের সম্রাট আকবরের দরবারে ও দরবারী আলেম ছিল। ]ইয়াজিদের দরবারে যেসকল হাক্কানি আলেম তাকে সমর্থন করেননি একটি পর্যায়ে অত্যাচারে অত্যাচারিত হয়ে হাক্কানি আলেমদের দল মক্কা শরীফ থেকে শুরু করে তথা মধ্যপ্রাচ্য থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায় ইয়াজিদ তার শাসনামলে প্রায় 70,000 আলেমকে হত্যা করেছিল যারা তাঁর বায়াত গ্রহণ করেনি কিংবা শাসক হিসেবে খলিফা হিসেবে তাকে মেনে নিতেও অপ্রস্তুত ছিল। এমনকি ইয়াজিদ মক্কা-মদিনায় আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ছিল। সুতরাং প্রকৃত ইসলাম ধারণ করা স্কলাররা, আলেম এবং আমলদার ব্যক্তিরা তখন থেকেই মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে দিয়ে আমাদের এই উপমহাদেশে চলে আসেন কিংবা পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় চলে গিয়ে দ্বীনের খেদমতে তাবলীগ শুরু করেন। । ইয়াজিদের তিন বছরের ইসলাম বিধ্বংশী শাসনামল কিংবা এই একটি ক্ষমতার (ওয়েব )যাওয়ার পরে পরবর্তীতে আরেকটি ওয়েব কিংবা ফেতনা সৃষ্টি বা শুরু হয় বর্তমান সৌদি আরবে আল সৌদের হাত ধরে।১৭০০ সালের শেষ দিকে ব্রিটিশদের রাজনৈতিক সহায়তায় অটোমান সাম্রাজ্যের তথা মুসলমানদের ক্ষমতা খর্ব করতে তথা মুসলমানদেরকে বিভাজন করতে আল সৌদের বাহিনীকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয় ব্রিটিশরা।

২. আধুনিক সৌদি আরবের জনক কিংবা প্রতিষ্ঠাতা কিংবা যার হাত ধরে আজকের ব্যতিক্রমী সৌদি আরব আমাদের চোখে দৃশ্যমান সেই ব্যক্তি তথা আল সৌদ যখন মক্কা শরীফ তথা হেজাজকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং রাজতন্ত্র চালু করেন তখন তিনিও চিন্তা করেন যে তারই রাজতন্ত্র কিংবা ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে হলে এমন এক শ্রেণীর আলেম তৈরি করতে হবে যারা তার রাজতন্ত্র নিয়ে, ক্ষমতা নিয়ে কখনো কোরআন হাদিসের আলোকে বিরোধিতা করবেন না। উল্টো কোরআন হাদিসের আলোকে তাঁর এই ক্ষমতা কিংবা রাজতন্ত্রকে বৈধতা দিয়ে যাবেন। অর্থাৎ দরবারী আলেম সৃষ্টি করে তাঁর আসন পাকাপোক্ত করতে হবে। একই কাজটি করেছিল ইয়াজিদ তার ক্ষমতার আমলে। এই কারণে ব্রিটিশদের পৃষ্ঠপোষকতায় একদিকে যেমন ক্ষমতা দখল নিয়েছেন আল-সৌদ, কায়েম করেছেন রাজতন্ত্র, ঠিক একই সময়ে এই বিষয়টি যেন মুসলমানরা বুঝতে না পারে তাই ক্ষমতা দখলের একই সাথে ইসলামের সংস্কারের ধোঁয়া তুলে তারা একটি ইসলামী মুভমেন্ট সমগ্র বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে যেটিকে আমরা ওহাবী আন্দোলন হিসেবে বুঝে থাকি।

৩. ভিতর দিয়ে রাজনীতির মারপ্যাঁচ, ক্ষমতা ,,আসন দখল থাকলেও বাইরে দিয়ে একটি ইসলামিক মুভমেন্টের প্রলেপ দিয়ে আজকে তারা প্রায় 200 বছর খুব সুন্দর করে দেশ শাসন করছেনযেটা মূলত রাজতন্ত্র এবং যেটা মূলত ইসলাম সমর্থন করে না । কিন্তু কোন ইসলামিক স্কলাররা সৌদি আরবের দিকে আঙ্গুল তুলেন নি কিংবা বলেননি যে আপনাদের ক্ষমতা অবৈধ ।

৪. এর কারণ খুঁজলে দেখা যায় প্রতিটি মসজিদ-মাদ্রাসায় পড়াশোনার মাধ্যমে যে আলেম তৈরি হয় সেই আলেমদের একটা বড় অংশ প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে সেই সিলেবাস থেকে তৈরি এমনকি তাদের অনেকই বৃত্তি, স্কলার্শিপ, অনুদান ,সাহায্য বা সহযোগিতা সেখান থেকে প্রাপ্ত। এক কথায় সৌদি আরব ঘুরে সেই অর্থে পড়াশোনা করে বিখ্যাত হয়, স্কলার হয় , এবং শেষ পর্যায়ে মাদানী উপাধি প্রাপ্ত হয় ।সুতরাং এসব আলেমদের দিনশেষে সৌদি আরব সমর্থিত তথাকথিত ইসলামের সিলেবাসের বিপক্ষে যাওয়ার টেকনিক্যালি সুযোগ থাকে না। সেই দিক থেকে আমাদের উপমহাদেশের ইসলামিক স্কলাররা অনেকটাই স্বাধীন । মূলত আমাদের উপমহাদেশের আলেমরা ইসলামিক শিক্ষা লাভ করেছিল ইয়াজিদ কর্তিক আঘাতপ্রাপ্ত নির্বাসিত পরবর্তী হাক্কানী আলেমদের দ্বারা বংশপরম্পরায়। তবে বর্তমানে সৌদি আরবের মিশন কিংবা ইয়াজিদের মিশন বিভিন্ন নামে অথবা নাম পাল্টিয়ে বিভিন্ন বিভিন্ন সংস্থার নামে বিভিন্ন টাইটেলের নামে বিভিন্ন পোশাকের নামে বিভিন্ন অর্থ পয়সা সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক মিশনকে ধর্মীয় মিশন হিসেবে নেপথ্যে পরিচালনা করে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছেন আমাদের দেশ তথা উপমহাদেশে। ৫###,ইসলাম ধ্বংসের ষড়যন্ত্র যে শুধু ইহুদী-নাসারাদের থেকে হয়েছে তা নয়, ষড়যন্ত্র মুসলমানদের ভেতর থেকেও হয়েছে যাদেরকে বলা হয়েছে মোনাফেক । এই বিভিন্ন ধরনের দ্বন্দ্ব এবং ষড়যন্ত্রের কারণে তার প্রভাব পড়ছে আজকে মসজিদে, মাদ্রাসায় ,আন্দোলনে, ক্ষমতায় এমনকি শবেবরাতে। আজকে টেলিভিশনে যাই আলেমরা ঘোমটা পরে শবে বরাতের বিরুদ্ধে ওয়াজ করেন আজ থেকে 20 বছর আগে এরাই টেলিভিশন দেখা হারাম, ছবি তোলা হারাম, এই ফতোয়া দিয়েছিল। কিন্তু 20 বছর পরে আজকে তারাই টেলিভিশন গুলোকে এমনভাবে কিনে নিয়েছে যে প্রতিটা টেলিভিশনে দেখবেন এই আলেমদের দখলে । কারি কারি অর্থের জোরে স্পন্সর ম্যানেজ করে টেলিভিশনগুলোকে দখল নিয়ে তারা তাদের মত ইচ্ছেমতো ইসলাম প্রচার করে বেড়াচ্ছে আজ।শবে বরাতের পক্ষে সহি হাদিস যেমন রয়েছে, কোরআনে এবং তাফসীরেও এর উল্লেখ রয়েছে । কিন্তু সে আলোচনা গুলো খুব কম হয় কেননা এখন সমগ্র বিশ্বের সত্তিকারের ইসলাম দরবারী আলেমদের নিয়ন্ত্রণে । হাক্কানী আলেমদের নিয়ন্ত্রণে আজ ধর্ম থাকলেও রাজনীতি নেই

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*